![]() |
| টলস্টয় এবং স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রিয়েভনা |
প্রায়শ রাতের খাবারে খাই ভেজিটারিয়ান ব্যাঙ্গার অর্থাৎ সয়া সসেজ এবং আলু, গাজর মেশানো ভর্তা। ডিশটার নাম ব্যাঙ্গার এন্ড সসেজ। সেদিন খেতে খেতে ভাবছিলাম, টলস্টয় একই খাবার সামনে নিয়ে বসলে, — আলু, গাজর, পেঁয়াজ, মাখন, পাশে সালাদপাতা — সব কিছু আসতো তার নিজের খামার থেকে। গর্ব করে কি বলতেন, “দেখো, আমি নিজে ফলিয়েছি”?
ফলাতেন না যে জানতেন। কাজ করতো মুজিক, মানে ভূমিহীন কৃষকেরা যারা কুলাক নামের বড় জমিদারদের জমিতে খাটতো। টলস্টয় নিজে ছিলেন এক রাজকীয় কাউন্ট, বিশাল খামার ছিলো তার। টলস্টয়ের সময় ভেজেটারিয়ান সসেজ তৈরি না হলেও, রাজনৈতিক ইক্ষনের সাথে জড়িয়ে নিরামিষাশী যাপনের পক্ষে তিনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন।মূলত এটি হাওয়ার্ড উইলিয়ামসের ১৮৮৩ সালের বই The Ethics of Diet-এর রুশ অনুবাদের ভূমিকাস্বরূপ লেখা হয়েছিলো। প্রবন্ধটিতে নিরামিষভোজনের পাশাপাশি নৈরাজ্যবাদ (anarchism) এবং শান্তিবাদ (pacifism)-এর বিষয়ও উঠে এসেছে।
এ লেখায় টলস্টয়ের যুক্তি ছিলো—নৈতিক উন্নতির পথে নিরামিষভোজন হলো “প্রথম পদক্ষেপ।” তিনি ধর্মীয়, নৈতিক ও মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে মাংসত্যাগ কেবল খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়, বরং মানবিক বিবেকের বিকাশের জন্য অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ।
১৮৮২ সালে টলস্টয় তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে তিনি মাংসহীন খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করতে চান এবং মূলত কাশা, জেলি ও সংরক্ষিত খাবার খেয়ে বাঁচতে চান। ছেলে সের্গেইয়ের কথায়, ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত টলস্টয় এ বিষয়ে সত্যিকারভাবে নিশ্চিত হননি—সেই সময় থেকে তিনি আন্তরিকভাবে নিরামিষভোজী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আমার নিজের জীবনে নিরামিষাশী যাপন শুরু হয়েছিলো ১৯৯০ সালে বিলাতে। ১৯৮৮ সালে আমার বৈমানিক বড় ভাই মিগ২১ ক্র্যাশে নিহত হলে, কয়েক মাস ধরে বাসায় এ মিলাদ, সে মিলাদ মিলায় গোস্তের মেলা শুরু হয়েছিলো। মৃতের বাড়িতে খাবার পাঠাতে হয়, সব আত্মীয় রাধা গোস্ত পাঠাতে থাকলো, কিছু দিনের ভেতর গোস্ত দেখলে আমার খাবারের ইচ্ছে মরে যেতো। ১৯৯০এ যখন বিলাতে এলাম, কিছু বাংলাদেশির সাথে ছিলাম, ওখানেও দৈনন্দিন খবার ছিলো ভাত এবং বিপুল পরিমাণ গোস্ত। কয়েক দিন থেকে সেখান থেকে সটকে পড়েছিলাম। তার পর অনেক বছর পুরোপুরি নিরামিষাশী ছিলাম।
কাশা, পরিজ, ফল, সবজির পাশাপাশি অপরাপর রুশিদের মত টলস্টয়ের জীবনের এক বড় অনুপান চা। ‘যুদ্ধ এবং শান্তি’এর লেখক লিও টলস্টয়কে বলা যাবে চা-পাগল, যেমন লিখতে ভালোবাসতেন, তেমনি চাও ভালোবাসতেন—যেমন অনরে দ্য বালজাক কফি ভালোবাসতেন। চা ছিলো তার লেখার “জ্বালানি”। কাজ করতে করতে তিনি গ্লাসে চা ঢেলে ধীরে ধীরে চুমুক দিতেন, আর দিনে ছয় লিটার পর্যন্ত চা পান করতেন!
ইয়াসনয়া পলিয়ানায় তার বাড়িতে অতিথি লেগেই থাকতো, সবাইকেই চা খাওয়ানো হতো। একবার ১৯০৭ সালে ৮০০ স্কুল শিশু এসেছিলো সেখানে। সারাদিন খেলেছে, গ্রীষ্মের ছুটি উপভোগ করেছে, আর চা খেয়েছে পেট ভরে। টলস্টয়ের স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনা পরে লিখেছিলেন—সেদিন প্রায় ৬০ বালতি, মানে ৭০০ লিটার মতো চা খাওয়া হয়েছি্লো!
চায়ের সুবাদে একবার টলস্টয় হঠাৎ একটু বাড়তি টাকাও রোজগার করেন। একদিন তিনি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন একটা ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানালা দিয়ে এক মহিলা যাত্রী তাকে দেখে ভেবেছিলেন সাধারণ কোনো বুড়ো লোক, চিৎকার করে বললেন—“এই, একটু গিয়ে আমার সঙ্গীকে বুফে থেকে নিয়ে এসো!” টলস্টয় বিনা বাক্যে কাজটা করে দিলেন। ফিরে আসার পর মহিলা তাঁকে পাঁচ কোপেক দিলেন—“চা খাওয়ার জন্য।”
এরপর ট্রেনের বগির ভেতরে ফিসফিস শুরু হলো—ওই যে দাঁড়িয়ে আছেন, উনি তো কাউন্ট টলস্টয়! মহিলা তখন ভয়ে-লজ্জায় পড়ে ক্ষমা চাইলেন, আর বললেন, “ওই পাঁচ কোপেকটা ফিরিয়ে দিন।”
টলস্টয় হেসে বললেন,
“না না, এটা আমি ফেরত দেব না! এই পাঁচ কোপেকটাই হয়তো জীবনে একমাত্র টাকা, যেটা আমি নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করেছি।”
এই বলে তিনি কয়েনটা পকেটে রেখে দিলেন।
টলস্টয়ের সময়ে রাশিয়ায় দাস বা সার্ফ প্রথা চলতো। ১৮৬১ সালে জার আলেকজান্ডার সেটা বাতিল করলেও, কৃষকেরা তখনো গবাদি পশু বা গাছপালা মতো জমিদারের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো। টলস্টয়ের সময়ের ভাবনা ছিলো — ঈশ্বর যা দিয়েছেন, যেমন দাস, স্ত্রী, সন্তান, জমি — তার যত্ন নেওয়া মানে খ্রিস্টান ধর্ম পালন। কিন্তু এ ভাবনার ফাঁকি তিনি ধরতে পেরেছিলেন , কারণ যারা আসলে কাজ করতো, ফসল ফলাত, তাদের মজুরি বা চাষের অংশ কিছুই দেয়া হতো না। রাজা বা জমিদার সে ফসল বিক্রি করে বিলাসিতা আর যুদ্ধ চালাতো, যেখানে সেই কৃষকদেরই সৈনিক হতে হতো। চার্চ মানুষকে বোঝাতো — রাজা ঈশ্বরের বাছাই করা প্রতিনিধি। বদলে রাজা চার্চকে বিপুল পরিমাণ জমি দিতো, আর সাধারণ মানুষের কাজ ছিলো — রাজা আর চার্চের জন্য খাটা। এই সিস্টেমের অংশ ছিলেন টলস্টয় — তবে নিজের সমাজের এবং চার্চের ভণ্ডামি তুলে ধরেছেন ‘Father Sergei’- নভেলাতে। তার সময়ের ইউরোপে কেউ যুদ্ধ বিরোধিতা করত না, কিন্তু টলস্টয় লিখলেন War and Peace। লেনিন তাকে “বুড়ো পাদ্রি” বলেছিলেন, কিন্তু নিশ্চিত করেছিলেন পুরো সোভিয়েত যেন টলস্টয় পড়ে। এমনকি সোভিয়েত প্রচার কাঠামো টলস্টয়ের সব কাজ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিলো। অদ্ভুত ব্যাপার — টলস্টয়কে সোভিয়েতরা কখনও নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু পাস্তেরনাক, সলঝেনিৎসিন, আনা আখমাতোভাদের মতো কবি-লেখকদের দমন করেছিল ভীষণভাবে। লেনিন টলস্টয়ের মধ্যে কি দেখেছিলেন? দুজনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতে পারতেন। প্লেখানভের মত লেনিন বুঝেছিলেন — শ্রেণিসংগ্রাম বা সামাজিক ন্যায়বিচারের কথাগুলোর ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক প্রতিফলন দরকার। টলস্টয় সে প্রতিফলনের অংশ ছিলেন। তবে লেনিনের ‘শ্রেণি-সন্ত্রাস' ধারণাটা সোভিয়েতরা এমনভাবে ব্যবহার করেছিল যে মানুষ শেষমেশ তাদের প্রত্যাখ্যান করে। যখন ক্ষমতাবানদের মানুষ প্রত্যাখ্যান করে, তারা নিজেদের ভুল না দেখে অন্যকে দোষ দেয়। যেমন রুশ রাজার পক্ষের লোকজন বলেছিল — “ফ্রান্স বিপ্লব উসকে দিয়েছে।”তার সাহিত্যকর্ম ও শিক্ষামূলক গল্পগুলোতে কৃষকদের বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—কখনো ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের আদর্শরূপে দেখানো হয়েছে (যেমন War and Peace-এর প্লাতন কারাতায়েভ থেকে Alyosha the Pot পর্যন্ত), আবার কখনো কৃষকগোষ্ঠীর প্রতি অবিশ্বাস বা হতাশা প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষত তাদের কৃষি-নবপ্রবর্তনের প্রতি একগুঁয়ে প্রতিরোধে।
শেষ পর্যন্ত টলস্টয় নিজে কৃষকের পোশাক পরিধান করতেন, নানা ধরনের কৃষিশ্রম ও হস্তশিল্পে যুক্ত হয়েছিলেন, এবং কৃষক ও ধর্মীয় উপদলীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গে উৎসাহভরে যোগাযোগ রাখতেন—তাদের সরল খ্রিস্টান বিশ্বাসকে গভীর শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছিলেন। কৃষক-শিশুদের জন্য তার পাঠ্য পুস্তক ও শিক্ষামূলক গল্পসংগ্রহে প্রায়ই লোককথা উঠে এসেছে, আর ভাষাশৈলীকে তিনি চূড়ান্ত সরলতায় নামিয়ে এনেছেন—যে সরলতাকে তিনি আদর্শ ও কাম্য বলে মনে করতেন।
জীবনের শেষ দিকে টলস্টয় রুশ কৃষিশ্রমিকদের মতামত ও অভিজ্ঞতা অনুসন্ধান করেছিলেন আবেগভরা সাংবাদিকতার মাধ্যমে। লেনিন তার এ অন্তর্দৃষ্টির প্রশংসা করেছিলেন, ফলে কৃষক-জীবনের উপস্থাপনায় টলস্টয়ের প্রভাব সোভিয়েত যুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।
বিপ্লবের সময় টলস্টয় বেঁচে থাকলে, কে জানে কি করতেন! হয়তো মায়াকোভস্কি, এসেনিনের আত্মহত্যা, পাস্তেরনাকের নিষেধাজ্ঞা, আখমাতোভার পরিবার ধ্বংস — এসব দেখে ভীষণ কষ্ট পেতেন। অথবা হয়তো চুপ থাকতেন, যেমন বার্থোল্ট ব্রেখট থেকেছিলেন পূর্ব জার্মানিতে।.jpg)